
আলোর যুগ প্রতিনিধিঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য নীতিগত রূপরেখা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামী। এতে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক মর্যাদাকে দেশের রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে রাখার কথা বলা হয়। সেখানে ছয় বিষয়ে ৩১ প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। এর মধ্যে রয়েছে টেকসই অর্থনীতি, দুর্নীতিমুক্ত, ব্যবসাবান্ধব পলিসি, কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, আইসিটিতে অগ্রাধিকার, তরুণদের জন্য পরিকল্পনা, রেমিট্যান্স সক্ষমতাসহ ৩১ দফা উন্নয়ন নির্দেশনা। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে জামায়াত আয়োজিত পলিসি সামিট-২০২৬-এ এ রূপরেখা উপস্থাপন করেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। পলিসি সামিটে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিভিন্ন দৈনিকের সম্পাদক, সাংবাদিক নেতাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশ এখন একটি সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়, বরং ১৮ কোটির বেশি মানুষের দেশের জন্য শাসনব্যবস্থার নতুন দিশা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষিত তরুণরা শিক্ষা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। নারীরা এখনো নানান কাঠামোগত বাধার মুখে পড়ছেন। প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেও কোটি কোটি মানুষ সামান্য একটি সংকটেই দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছে। এ বাস্তবতাগুলো সৎভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’
পলিসি সামিটে প্রস্তাব : দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। ট্যাক্স ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) বর্তমান হার থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স ১৯ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু করা হবে (এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এক কার্ডে)। আগামী তিন বছরে সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। বন্ধ কলকারখানা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু এবং ১০% মালিকানা শ্রমিকদের দেওয়া হবে। ব্যবসাবান্ধব পলিসি তৈরি, সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের জন্য সুদবিহীন ঋণসুবিধা দেওয়া হবে।
শিক্ষাসংক্রান্ত প্রস্তাব : গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। প্রতি বছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়া হবে, যাতে গরিবের মেধাবী সন্তানও হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজে পড়তে পারে। ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনমিকস কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে। সব নিয়োগ হবে মেধাভিত্তিক।
স্বাস্থ্যসেবাসংক্রান্ত প্রস্তাব : ৬০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়স্ক ও পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে। ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার ০আওতায় নিয়ে আসা হবে।
তরুণদের জন্য পরিকল্পনা : দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। পাঁচ বছরে ১ কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন করা হবে। প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে পাঁচ বছরে ৫০ লাখ জব অ্যাকসেস নিশ্চিত করা হবে। নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা এবং ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে। স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা হবে।
আইসিটি ও ভিশন ২০৪০ : আইসিটি সেক্টর উন্নয়নে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করা হবে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি জব সৃষ্টি ও প্লেসমেন্ট করা হবে। ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন, আইসিটি সেক্টর থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ, আইসিটি খাতে সরকারের ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। রেমিট্যান্স-সংক্রান্ত প্রস্তাব : দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি করা হবে। অর্থনৈতিক রেমিট্যান্সের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি প্রফেশনাল, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে নিয়ে আসা হবে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে।
