Sunday, January 18, 2026
Homeআন্তর্জাতিকযে কারণে ইরানে জয়ের সহজ কোনও পথ নেই ট্রাম্পের: আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

যে কারণে ইরানে জয়ের সহজ কোনও পথ নেই ট্রাম্পের: আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

আলোর যুগ প্রতিনিধিঃ গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ইরান। ওই সময় বিক্ষোভকারীদের দমন-পীড়নের অভিযোগ এনে তেহরানে হামলার হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরিস্থিতি বিবেচনায় গত সপ্তাহে সেই হামলা অত্যাসন্ন ছিল। কিন্তু হামলা থেকে বিরত থাকেন ট্রাম্প। তবে তিনি বলছেন, ইরান প্রশ্নে তার লক্ষ্য হলো ‘জয়’ পাওয়া। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শবাদী ও অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াইরত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ কোনও বিজয়ের পথ নেই; বরং সামরিক সংঘাতে জড়ালে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, ইরানে সরকারের ওপর বড় ধরনের হামলা হলে তেহরান অর্থবহ ও শক্ত প্রতিশোধ নিতে পারে। আর সেই প্রতিশোধ গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কিংবা ২০২০ সালে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর ইরানের তুলনামূলক প্রতীকী প্রতিক্রিয়ার মতো হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যা করতে ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ চালালেও যে তাতে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে তার নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তা যুক্তরাষ্ট্র ও পুরো অঞ্চলের জন্যই ভয়াবহ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। স্টিমসন সেন্টারের বিশিষ্ট গবেষক বারবারা স্লাভিন বলছেন, সব বিকল্পই ভয়াবহ। কোনও ধরনের হামলার পরিণতি কী হবে তা বোঝা খুবই কঠিন। বিশেষ করে শাসকগোষ্ঠী যদি মনে করে তার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাহলে তারা এই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী ও মিত্রদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নিতে পারে।

প্রতিবাদ, হুমকি ও পিছু হটা

সম্প্রতি ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার হলে ট্রাম্প এ বিষয়ে সরব হন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে। গত ২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে এবং তারা প্রস্তুত রয়েছে। পরবর্তী দুই সপ্তাহে তিনি বারবার একই হুমকি দেন এবং বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সহায়তা আসছে’।

অন্যদিকে বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার কঠোর দমন অভিযান চালায়। মানবাধিকারকর্মীদের হিসেবে, নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইরানে পুরোপুরি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যেই ট্রাম্পের অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। এক বক্তব্যে তিনি ইরানি কর্তৃপক্ষের বয়ান তুলে ধরে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলার জবাব দিচ্ছিল তারা। তিনি জানান, ইরান তাকে আশ্বস্ত করেছে যে, কোনও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে না। এর দুই দিন পর ট্রাম্প জানান, বৃহস্পতিবার নির্ধারিত ৮০০ মৃত্যুদণ্ড বাতিল করায় তিনি ইরানের প্রতি ‘সম্মান’ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন।

সামরিক অপশন এখনও বিবেচনায়

কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আপাতত আন্দোলনের গতি কমেছে। তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরানে ঠিক কী হচ্ছে তার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট শেষ হয়নি। পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। আন্দোলন আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে, আর ট্রাম্প সামরিক পন্থায় এগোনোর সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করেননি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী বহরও নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প আগেও নিজের লক্ষ্য পূরণে সামরিক শক্তি ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিকে হত্যার কথা, সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কথা উল্লেখ করে গর্ব করেছেন। চলতি মাসেই তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার নির্দেশ দেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে দ্রুত সামরিক বিজয়ের সম্ভাবনা খুবই কম। স্লাভিন বলেন, এটা ভেনেজুয়েলা নয়। এটা একবারেই শেষ হয়ে যাবে— এমন কিছু নয়। গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো বিতর্কিত উদ্যোগসহ এত সংকটের মধ্যে ট্রাম্প কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধ চান?

ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া

২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের জবাব ছিল সীমিত। কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলেও কোনও প্রাণহানি হয়নি। তবে বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সির মতে, তেহরান এখন আর বড় সংঘাত এড়াতে হামলা সহ্য করার নীতি মানবে না। তার ভাষায়, ট্রাম্পের সাফল্যের মানদণ্ড আর ইরানের মানদণ্ড এক নয়। ইরান যুদ্ধ জিততে না পারলেও, যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়াতে পারলে সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তেলের দাম বাড়া, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি— সব মিলিয়ে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

চাপেও টিকে আছে ইরান

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা মোকাবিলা করে টিকে আছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ৪৭ বছরের ইতিহাসে দেশটি এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। তেহরানের গড়ে তোলা আঞ্চলিক জোট প্রায় ভেঙে পড়েছে। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের অভিযানে হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়েছে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন ঘটেছে। ভেনেজুয়েলাতেও মাদুরো আটক হওয়ায় ইরান এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হারিয়েছে।

ইসরায়েল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার পর দেশটির প্রতিরোধক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচিও বড় ধাক্কা খেয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে রিয়ালের মূল্য ৯০ শতাংশের বেশি কমেছে। তার ওপর সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সরকারকে বৈধতার বড় সংকটে ফেলেছে।

কূটনৈতিক পথে সমাধানের সুযোগ কতটা?

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম ইরানে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। তবে উপসাগরীয় মিত্ররা অস্থিরতা ও যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশের ভেতরে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরোধী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমর্থকদের কথাও ভাবতে হচ্ছে।

বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের আশা এখনও আছে। তবে ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো অনেকটাই আত্মসমর্পণের মতো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবুও সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে সমঝোতায় যেতে পারে ইরান।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments