
আলোর যুগ প্রতিনিধিঃ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর আগে যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল, তখন ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ তৈরি করা হয়, যা ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন—অর্থাৎ এক কথায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের কল্যাণ দেখভাল করে থাকে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আগামী দিনে সরকার গঠনে সক্ষম হলে, এই শহীদ পরিবার যারা আছেন, জুলাই যোদ্ধা যারা আছেন—জুলাই আন্দোলনের যারা শহীদ পরিবার বা যোদ্ধা আছেন—তাদের যে কষ্টের কথাগুলো যে কজন মানুষ তুলে ধরেছেন—এই কষ্টগুলোকে যাতে আমরা কিছুটা হলেও সমাধান করতে পারি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রবিবার এক মতবিনিময়ে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর ফার্মগেট-খামারবাড়ি এলাকায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এ মতবিনিময় সভা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এতে বিএনপির অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিরেন। ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানও।
তারেক রহমান বলেন, যাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি তাকে তো আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না, কিন্তু যারা পেছনে রয়ে গিয়েছেন সেই পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধাগুলো যাতে দেখভাল করতে পারি—এই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। কারণ ওনারাও একজন মুক্তিযোদ্ধা, আপনারাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই গণ্য। ৭১ সালে এদেশের মানুষ, মুক্তিযোদ্ধারা এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জীবন দিয়েছিলেন, এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যোদ্ধারা ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন; ঠিক একইভাবে চব্বিশে যে যোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন তারা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছিল ৭১ সালে, তাকেই আবার রক্ষা করা হয়েছে ২০২৪ সালে। সেজন্যই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আমরা আরেকটি ডিপার্টমেন্ট তৈরি করব যাদের দায়িত্ব হবে এই মানুষগুলোর দেখভাল করা, ইনশাআল্লাহ।
তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম হয়েছে, খুন-অপহরণের শিকার হয়েছে। এরকম অনেকগুলো পরিবারের সাথে গতকাল আমার কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে। অসংখ্য অগণিত পরিবার সব হারিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে। শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও ১৪শ এরও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৩০ হাজারের মতন মানুষ। এই ৩০ হাজারের মতন মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের সংখ্যা ৫০০ এর মতন—যাদের কারো এক চোখ অথবা কারো দুচোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পঙ্গু হয়েছেন অনেকে। জুলাই অভ্যুত্থানে যেভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে—১৫শ এর মতন মানুষকে যে হত্যা করা হয়েছে—এটিকে এক বাক্যে স্রেফ আমরা একটি ‘গণহত্যা’ বলতে পারি। বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন, তাদের অনেকেই আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত আছেন, আমাদের সামনে বক্তব্যও রেখেছেন কেউ কেউ। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী আহতদের যারা বক্তব্য রেখেছেন তাদের কষ্টের কথাগুলো আমরা শুনেছি। প্রিয় ভাইয়েরা, আপনাদের কারণেই, আপনাদের সাহসী ভূমিকার কারণেই—যারা শহীদ হয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন—আপনাদের সাহসী ভূমিকার কারণেই ফ্যাসিবাদী চক্র শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা নয়, বরং এদেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট আমি আপনাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে একটি বক্তব্য রেখেছিলাম। সেই বক্তব্যে আমি বলেছিলাম—বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শহীদ আবু সাঈদ, মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, কলেজ ছাত্র ওয়াসিম আকরাম, মাদ্রাসা ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্কুল ছাত্র রিফাত হোসেন, কুমিল্লার আইনজীবী আবুল কালাম, চুয়াডাঙ্গার রাজমিস্ত্রি উজ্জ্বল হোসেন, নোয়াখালীর দোকান কর্মচারী আসিফ, বরগুনার ওষুধ কোম্পানির সেলসম্যান আল আমিন, পাবনার গাড়িচালক আরাফাত হোসেন, মিরপুরের গুলিববিদ্ধ ২২ বছর বয়সী মুত্তাকিম, দোকান কর্মচারী আতিকুল, অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তামিমের মতন অনেকের হাত কিংবা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। গণহত্যা থেকে ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপও রেহাই পায়নি সেদিন। এক বক্তব্যে হয়তো আমরা সকলের নাম বলতে পারব না—এত মানুষ শহীদ হয়েছেন, এত মানুষ আহত হয়েছেন। ফ্যাসিবাদ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের স্বাধীনতা প্রিয়, গণতন্ত্রকামী প্রত্যেকটি সেক্টরের প্রতিটি শ্রেণিপেশার মানুষ সেদিন রাজপথে নেমে এসেছিল। সেদিনের যত ছবি উঠেছে, ক্যামেরায় বন্দি যত ছবি উঠেছে—প্রত্যেকটি ছবি এই কথাটিরই সাক্ষ্য দেয়। ২০২৪ সালের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর নয়।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এই আন্দোলন ছিল সত্যিকার অর্থেই অধিকারহারা গণতন্ত্রকামী মানুষের গণআন্দোলন। একারণেই আমি বলি—১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। সুতরাং ২০২৪ সালকে যদি সুসংহত করতে হয়, তাহলে এদেশের সকল নারী-পুরুষ তথা প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। যারা স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনকে দলীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে পরিণত করতে চায়, তাদের সম্পর্কে স্বাধীনতা প্রিয় গণতন্ত্রকামী মানুষকে অবশ্যই সজাগ থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বীর শহীদ এবং আহত ও হতাহতদের প্রতি রাষ্ট্রের অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে। একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সেই দায়িত্ব অনুভব করে, যার কথা একটু আগে আমি এবং আজকের অনুষ্ঠানের সভাপতি সাহেব উল্লেখ করেছেন আপনাদের সামনে। জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে অবশ্যই পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা আমাদের সেই দায়িত্ব, সেই অঙ্গীকার, সেই প্রতিশ্রুতি আপনাদের সামনে এবং দেশের মানুষের সামনে ইনশাআল্লাহ পূরণ করব। তারেক রহমান আরও বলেন, আমরা যদি একটি নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হই আগামী দিনে—তাহলে এভাবেই আমাদেরকে শোক সমাবেশ আর শোকগাঁথা চলতে থাকবে। সুতরাং আর শোকগাঁথা বা শোক সমাবেশ নয়, বরং আসুন গণতন্ত্রকামী মানুষ আগামীর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিজয়গাথা রচনা করবে ইনশাআল্লাহ।
