তিনিই সরাইল সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসের ঘুষ লেনদেন অফিসার!

0
223
শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ

আরিফুল ইসলাম সুমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসে কর্মরত অবস্থায় মোঃ লাল হোসেন বিগত ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর চাকুরি বিধি মোতাবেক অবসর নেন। কিন্তু লাল হোসেনকে সরকার চাকুরি থেকে বিদায় দিলেও এখানকার বর্তমান সাব-রেজিষ্ট্রার তাকে ব্যক্তিগত ক্যাশিয়ার হিসেবে নিজ দফতরে রেখে দেন।

লাল হোসেন এখন সাব-রেজিষ্ট্রারের ঘুষ লেনদেন অফিসার হিসেবে দফতরে পরিচিত। সকলেই তার কাছে জিম্মি। লাল হোসেন সিগনাল দিলেই সাব-রেজিষ্ট্রার দলিল সম্পাদন করেন। তাই এখানকার সকল দলিল লেখক আগে তার টেবিলে দলিলের সকল কাগজপত্র জমা দিতে হয়।

আজ মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিন সরাইল সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসে গিয়ে দেখা যায়, লাল হোসেন দফতরে সম্পাদনের জন্য দাখিল করা দলিল একের পর এক বুঝে নিচ্ছেন, পাশাপাশি টাকা গুনে টেবিলের ড্রয়ারে রাখছেন। সামনেই এজলাসে বসে দলিলে স্বাক্ষর করছেন সাব-রেজিষ্ট্রার।

তবে প্রতিটি দলিলের স্বাক্ষরের সময়ে সাব-রেজিষ্ট্রার তার ক্যাশিয়ার লাল হোসেনের দিকে তাকাচ্ছেন।
এসময় সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে লাল হোসেন সতর্ক হয়ে পড়েন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি চাকুরি থেকে বিদায় নিয়েছি ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তবে বর্তমান সাব-রেজিষ্ট্রার স্যারের অনুমতিতেই আমি এখানে বসে অফিস করে আসছি দীর্ঘ দিন যাবত।

দলিল গ্রহণ ও টাকা গুনে টেবিলের ড্রয়ারে রাখার বিষয়ে লাল হোসেন বলেন, সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসে নগদ টাকা লেনদেনের নিয়ম নেই, সকল টাকা ব্যাংকে জমা হওয়ার কথা। তবে আমি স্যারের (সাব-রেজিষ্ট্রার) নির্দেশেই এসব টাকা গ্রহণ করে আসছি। সরকারি দফতরে এভাবে বসে অফিস করার বৈধতা আমার নেই, তবে সবই স্যারের নির্দেশেই করছি। স্যার সামনেই আছেন, আপনারা জিজ্ঞেস করেন।

এদিকে সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি জানান, লাল হোসেন, স্যারের খুবই বিশ্বস্ত একজন মানুষ। স্যারের দফতরের ব্যক্তিগত সকল লেনদেন তার মাধ্যমেই হয়। তাই অনেকে লাল হোসেনকে সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসের ঘুষ লেনদেন অফিসার হিসেবে চিনেন।

সরাইল সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসের অফিস সহকারি মোঃ সুরুজ মিয়া বলেন, লাল হোসেন থাকাতে স্যারের কাজ করতে খুব সহজ হয়। আমরাও তার কাছ থেকে অনেক কাজ শিখে নিচ্ছি। দফতরের ‘মোহরার’ শরিফুল ইসলাম বলেন, লাল হোসেন স্যারের ব্যক্তিগত লোক। দফতরের গুরুত্বপূর্ণ কাজ তার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাই আমিও তার কাছ থেকে শিখছি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরাইল সাব-রেজিষ্ট্রার অফিস ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে চলছে। টাকা হলেই সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রেজিষ্ট্রি সম্পাদন হচ্ছে। ভুয়া নামজারি দেখিয়ে অথবা নামজারি ছাড়াই দলিল সম্পাদন করা হচ্ছে। এমনি একজনের জমি অন্যজনকে দিয়ে দলিল সম্পাদন করার ঘটনাও ঘটছে।

এছাড়াও নির্দিষ্ট ফি ছাড়াও ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেয়া হচ্ছে। সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ ও দলিল লেখক সমিতির নামে বাধ্যতামূলক ফি সহ নানা অজুহাতে এসব অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।

দলিল লেখক সূত্রে জানা গেছে, লেখক সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারির সাথে সাব-রেজিষ্ট্রার যোগসাজশের মাধ্যমে জমি ক্রেতাদের বিভিন্ন ভাউছার দেখিয়ে দলিল প্রতি মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।

এছাড়া জমির আকার পরিবর্তন করে জমির প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়েও দলিল লেখকরা মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

বিক্রেতাদের নামজারি জমাবাগের পর্চা এবং খাজনার রশিদ ছাড়াই অতিরিক্ত টাকা দিলেই কোন সমস্যা হয় না। দলিল লেখকরা নিজেরাই ভুয়া পর্চা ও খাজনার রশিদ তৈরি করে সাব-রেজিষ্ট্রারকে দেখিয়ে জমি দলিল সম্পাদন করা হচ্ছে। অবশ্য এসব দলিলের জন্য সাব-রেজিষ্ট্রারকে দলিল প্রতি বাড়তি ৫শ’ টাকা দিতে হচ্ছে বলে বিভিন্ন দলিল লেখক সূত্রে জানা গেছে।

তা’ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন তহসীল অফিসের ওমেদারগণ এ সকল ভুয়া খারিজ তৈরির সাথে জড়িত রয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

একটি সূত্র জানায়, ৫ লাখ টাকা মূল্যের উপরের দলিলে লাখে ২ শত থেকে ৪ শত টাকা ঘুষ দিয়ে জমির মূল্য কম দেখিয়ে দলিল সম্পাদন করা হচ্ছে। ফলে সরকার মোটা অঙ্কের রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে এবং গ্রহীতারও ভূমি মালিকানার জটিলতার সম্মূখীনের সম্ভাবনা থাকছে।

সরাইল সাব-রেজিষ্ট্রার মোঃ আবদুর রশিদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সকল নিয়ম মেনে এবং কাগজপত্র যাচাই বাছাই করেই দলিল সম্পাদন করা হয়। দলিল সম্পাদন করতে তাকে কোন টাকা দিতে হয় না।

দফতরের কাজের সুবিধার জন্যে লাল হোসেনকে এখানে টেবিলে বসানো হয়েছে। ব্যাংক ছাড়াও কিছু কিছু বিষয়ে এখানে নগদ লেনদেন করার বিধান আছে। তাই এসব অর্থ লাল হোসেনের মাধ্যমে নেওয়া হয়, তবে তা ঘুষ নয়।


শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ