সরাইলে নৌকাকে ফেল করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ !

0
210
শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ

আরিফুল ইসলাম সুমন, (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ‘নৌকা’ প্রতীকের চরম ভরাডুবি’র কারণ খুঁজছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। দল ক্ষমতায়, তাছাড়া অত্র নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিগত দিনে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এতোকিছুর পরেও এখানে নৌকা’র এমন শোচনীয় পরাজয় যেন মেনে নিতে পারছেন না দলটির ত্যাগী ও জেষ্ঠ নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা।

জানা গেছে, এখানে নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য প্রবীণ নেতা শফিকুর রহমান (নৌকা)। অপরদিকে আওয়ামী লীগের তিনজন বিদ্রোহী প্রার্থী সহ এখানে নির্বাচনে সাতজন চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ছিলেন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা হলেন- উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন ঠাকুর (ঘোড়া প্রতীক) ও উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা পরিষদের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান শের আলম মিয়া (মোটরসাইকেল) এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য মুখলেছুর রহমান (চিংড়ি মাছ)।

এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আলহাজ্ব রফিক উদ্দিন ঠাকুর তার ঘোড়া প্রতীকে সর্বোচ্চ ৩১,৪৮৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতীদ্বন্দ্বি শের আলম মিয়া মোটরসাইকেল প্রতীকে পেয়েছেন ২২,৭৫৮ ভোট। ‘আনারস’ প্রতীকে ১৭,৮৬১ ভোট পেয়ে বিএনপির (বহিস্কৃত) নুরুজ্জামান লস্কর তপু তৃতীয় হন। চতুর্থ স্থানে ‘নৌকা’ ভোট পড়েছে ১৩,২৭৩টি। পঞ্চম স্থান অর্জন করেন বিদ্রোহী প্রার্থী মুখলেছুর রহমান ‘চিংড়ি মাছ’ প্রতীকে ৫,৫৪৫ ভোট পেয়ে।

এদিকে নৌকার ব্যাপক পরাজয়ের কারনে এখানকার আওয়ামী লীগের প্রথমসারির অনেক নেতা কথা বলতে নারাজ। তবে তৃণমূলের অনেক নেতা এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেন। অরুয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী আবু তালেব মিয়া জানান, এখানে নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগ ত্রিমুখী হয়ে পড়েন। কিছু নেতা নৌকার পক্ষে কাজ করলেও বেশিরভাগ নেতা এখানে প্রকাশ্যে নৌকার বিরোধীতা করে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেন। তাছাড়া দলের মনোনয়নেও গাফিলতি ছিল। দলের প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের ভোটে রফিক উদ্দিন ঠাকুর সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন, অথচ দল তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি। যিনি এখানে নৌকা প্রতীক পেয়েছিলেন, তিনি দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কাছে একজন অপরিচিত মুখ।

কালীকচ্ছ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মুছা মৃধা জানান, এখানে দিনে নৌকার পক্ষে কাজ করলেও রাতের আধারে অনেক নেতা-কর্মী দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন। এই কারণেই এখানে নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নৌকা’র এ পরাজয় দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের আহত করেছেন বলে প্রবীণ এই নেতা জানান। পাকশিমুল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম নৌকার পরাজয়ের ব্যাপারে কথা বলতেই রাজি হননি। পানিশ্বর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন জানান, এখানে দলের প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল ছিল। নৌকার প্রার্থী সকলের সাথে যোগাযোগ করেননি। তাছাড়া তিনি এলাকার অপরিচিত মুখ। এ কারণে নৌকার পরাজয় হয়েছে। উপজেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আশরাফ উদ্দিন মন্তু জানান, এখানে নৌকা প্রতীক যাকে দেওয়া হয়েছিল, তিনি একজন জনবিচ্ছিন্ন নেতা। তিনি এখানে কখনো আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না। তাই দলের নেতা-কর্মীরা তাঁর প্রতি বিমূখ ছিলেন।

তবে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শফিকুর রহমান দাবি করেন, তাঁকে এখানকার আওয়ামী লীগের নেতারা ফেল করে দিয়েছেন। তিনি জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়কের বাড়ির কেন্দ্রে নৌকা ভোট পেয়েছে মাত্র ৭৪টি। এই কেন্দ্রে ১০৬৯ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হন। নৌকার পক্ষে নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রধান ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ফরহাদ রহমান মাক্কি। অথচ তাঁর কেন্দ্রে নৌকায় ভোট পড়েছে ১৪৫টি। এই কেন্দ্রে বিদ্রোহী প্রার্থী ১১২৫ ভোট পান। চুন্টা আওয়ামী লীগের সভাপতির কেন্দ্রে নৌকা পেয়েছে মাত্র ৮৯ ভোট।

কালীকচ্ছ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিঃ সহ-সভাপতি আমির আলীর বাড়ির গলানিয়া কেন্দ্রে নৌকা পেয়েছে মাত্র সাত ভোট। আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যের বাড়ি কুট্টাপাড়া পূর্ব কেন্দ্রে নৌকা ভোট পেয়েছে মাত্র ১৬টি এবং কুট্টাপাড়া পশ্চিম কেন্দ্রে নৌকায় ভোট পড়েছে ৫১টি। ওই কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ১৮৬৪টি। এভাবেই আওয়ামী লীগ নেতারা ষড়যন্ত্র চালিয়ে নৌকাকে ডুবিয়ে দিয়েছেন।

শফিকুর রহমান আরো জানান, জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর হাতে নৌকা তুলে দিয়েছিলেন। নির্বাচনী মাঠে প্রচার-প্রচারণায় তাঁর কোনো গাফিলতি ছিল না। তবে আওয়ামী লীগ নেতারা পরিকল্পিতভাবে তাঁকে এই পরাজয়ের মালা পড়িয়ে দিবেন, তা তাঁর জানা ছিল না।

সরাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শফিকুর রহমান নির্বাচনী মাঠে ব্যর্থ ছিলেন। তাঁকে ঘিরে নৌকা প্রতীকের এখানে পরাজয় ঘটবে, তা আগে থেকেই সকলেই টের পেয়েছিলেন। তাই বেশিরভাগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেন। তারপরও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা এখানে নৌকা প্রতীককে জয়ী করতে নানা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন।


শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ