বাড়ছে গ্যাসের দাম, বাড়বে পণ্যেরও দাম

0
38
শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ

ক্রাইম অনুসন্ধান ডেস্ক: চলতি মাসেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে গণশুনানি হয়ে গেল। তবে হাইকোর্ট রিটের প্রেক্ষিতে গ্যাসের দাম বাড়ানো ৬ মাসের জন্য স্থগিত করেছেন। এরপরও আতঙ্কে আছেন সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়লে বাড়বে পণ্যের দাম। এতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা রয়েছে। চাপে পড়বে নির্ধারিত আয়ের মানুষ। এ ছাড়া শিল্পোৎপাদনে খরচ বেড়ে যাবে। যার প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। অন্যদিকে গ্যাসের দাম বাড়ালে কয়েকটি দল আন্দোলনে নামবে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গ্যাসের বিতরণ কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে। পাঁচটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্য, বিদ্যুৎসহ সব খাতেই দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। এ নিয়ে টিসিবি অডিটরিয়ামে গণশুনানিও অনুষ্ঠিত হয়েছে চলতি মাসে। বিদ্যুতের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩.১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.৭৪ টাকা, সিএনজি ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮.১০ টাকা, প্রিপেইড মিটারে ৯.১০ টাকা থেকে ১৬.৪১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সার উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার ২.৭১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮.৪৪ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯.৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮.০৪ টাকা, শিল্পে ৭.৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪.৪৫ টাকা, বাণিজ্যিকে ১৭.০৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪.৫০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবাসিকে এক চুলার দর ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, দুই চুলা ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪৪০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের দাম প্রায় ক্ষেত্রে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রতিটি জিনিসের ওপর তার প্রতিক্রিয়া হবে এবং জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। মালিবাগের গৃহবধূ শামীমা জানান, গ্যাসের দাম বাড়লে তার সংসার চাপে পড়বে। কেননা, তার তো আয় বাড়ছে না। তাহলে এই টাকা আসবে কোথা থেকে। বাধ্য হয়েই বাজারের তালিকা থেকে কিছু একটা বাদ দিতে হবে। মগবাজারের বেসরকারি একটি কোম্পানিতে কাজ করেন লাইজু ইসলাম। গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাড়তি বিল তিনি কোথায় পাবেন। গ্যাসের দাম বাড়লে তার তো বেতন বাড়বে না। এতে তিনি চাপে পড়বেন। প্রায় একই ধরনের কথা বলেন, রাজধানীর অনেক বাসিন্দা। ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় ছোট একটা কারখানা পরিচালনা করেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়লে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ভোক্তা হয়তো পণ্যকেনা কমিয়ে দেবেন। এতে তার ব্যবসা ক্ষতির শিকার হতে পারে। এদিকে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ৬ মাসের জন্য দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া স্থগিত করেছেন আদালত। তারপরেও আতঙ্কে রয়েছে দেশের জনগণ। অবশ্য রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ারুল ইসলাম জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করেছেন এবং বিতরণ কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে যা বলুক না কেন, যৌক্তিক পর্যায়ে সবকিছু বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণের কথাও বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, পুরনো দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দর স্থির করা হবে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের দাম গড়ে ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়। সে বছরের মার্চ ও জুলাই থেকে দুই ধাপে তা কার্যকর হয়।

এত উচ্চ হারে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আসলো কেন? বাংলাদেশে এখন গ্যাস মজুদ আছে ১৪.৩২ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট (টিসিএফ) আর আমাদের বর্তমানে গ্যাস প্রয়োজন হয় বার্ষিক এক টিসিএফ। গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। বিশেষত গ্যাসনির্ভর বস্ত্র ও পোশাক কারখানার ওপর এ সিদ্ধান্ত মরণাঘাত হানবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজনীতিক জোনায়েদ সাকী বলেন, সরকার নতুন করে গ্যাসের যে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে দেশের গ্যাসনির্ভর বস্ত্র ও পোশাক কারখানাগুলো লোকসানের মুখে পড়বে। একে একে বন্ধ হয়ে যেতে পারে এসব শিল্প; যা এ খাতের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। অবিবেচক এ সিদ্ধান্তের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সঙ্কুচিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক খাত ও কর্মসংস্থানে আঘাত আসতে পারে। বস্ত্র ও পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, দর বৃদ্ধির আগে এ খাতের ওপর কী ধরনের প্রভাব আসতে পারে তা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে এমনটিই দেখতে চান তারা। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম মূল্যবৃদ্ধি সহনীয় মাত্রায় রাখার দাবি জানিয়েছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি আমরা কখনো মেনে নেব না। এদেশের মানুষও মেনে নেবে না। আমরা এর বিরুদ্ধে আমাদের যতটুকু সম্ভব প্রতিবাদ করব।

জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবন এমনিতেই দিশেহারা। এ অবস্থায় গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হলে তা হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেছেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি হলে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, গ্যাস কোম্পানিগুলো লাভজনক অবস্থায় আছে। এরকম অবস্থায় গ্যাসের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির যুক্তি কোথায়? গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়িভাড়া, যাতায়াত, পণ্য পরিবহনসহ সব খাতের ব্যয় আরো বেড়ে যাবে।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি জায়েজ করার নামে সদ্য সমাপ্তি গণশুনানিকে গণদুশমনী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ‘গ্যাসের দাম বাড়ালে পরিবহন, বিদ্যুৎ পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সব খাতে ব্যয় বাড়বে? এই বাড়তি ব্যয়ের প্রতিটি অর্থ আবার ব্যবসায়ীরা জনগণের কাছ থেকেই পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে আদায় করবেন? ফলে শেষ পর্যন্ত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির মূল্য সাধারণ মানুষকেই দিতে হবে? ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আর লাভবান হবেন মাত্র ৫ থেকে ১০ ভাগ মানুষ? গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, প্রস্তাবিত হারে গ্যাসের দাম বাড়ালে গার্মেন্টস সেক্টর বিশেষ করে টেক্সটাইল কারখানাগুলো টিকে থাকতে পারবে না? বর্তমানে সুতা উৎপাদনের যে খরচ, সেটাই উঠছে না? বিদেশি সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাচ্ছে না? আমাদের তো সুতা আমদানি করতে হয়? সেখানে ভারত, চীন, পাকিস্তান নিজেরা সুতা উৎপাদন করে?


শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ