ইসলামে মৌলিক পাঁচটি শিষ্টাচার

0
35
শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ

ক্রাইম অনুসন্ধান ডেস্ক: হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে শিষ্টাচার নেই তার মধ্যে কোনো জ্ঞান নেই।’ (দেখুন : মুহাম্মদ ইবন উমার নববি, নাসাইহুল ‘ইবাদ ফি বায়ানিল আলফাজ’, পৃ. ২৪)। কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাছাড়া বলা হয়, ‘একটি মানুষ কথা বলতে শেখে ২ বছরে, আর কখন কোন কথা বলতে হয়, তা শিখতে লাগে সারাটি জীবন।’ এ নিবন্ধে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পাঁচটি মৌলিক শিষ্টাচার তুলে ধরা হলো যার বাস্তবায়নে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে একে অপরের মাঝে সম্প্রীতি বৃদ্ধির পাশাপাশি শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

১. যে কোনো কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা

আমরা বৈধ যে কাজই করি না কেন তার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) বলাটা ইসলামের অন্যতম শিষ্টাচার। এর মাধ্যমে প্রত্যেক কাজের শরুতেই আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। সুতরাং সেখানে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করার সম্ভাবনা কমে যায়, আর আল্লাহকে স্মরণ করার কারণে সে কাজে বরকত বাড়িয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে কোনো কাজ, যার শুরুতে বিসমিলল্লাহ বলা হয়নি, সেটি (আল্লাহর রহমত থেকে) বিচ্ছিন্ন।’ (সুনানু আহমদ, খ- ১৪, হাদিস : ৩২৯)। আমরা একটি হাদিসে পাই, হজরত ওমর বিন আবি সালামাহ বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন খাবার সময় পাত্রের (প্লেটের) এদিক-সেদিক থেকে গ্রহণ করতাম। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে নির্দেশ দিলেন ‘হে বৎস! আল্লাহর নাম নিয়ে খাবার শুরু করো, ডান হাত দিয়ে খাও এবং পাত্রের তোমার নিকটবর্তী স্থান থেকে খাবার গ্রহণ করো।’ এরপর থেকে খাবারের সময় রাসুল (সা.) এর নির্দেশনাই পালন করে চলি।’ (বোখারি : ২৮৮)।

২. সম্বোধনের শুরু হবে ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলে বা ‘সালাম’ দিয়ে

অর্থাৎ সালাম দিয়েই আমাদের একে অপরের মাঝে কথাবার্তা শুরু হবে। ইসলামের একটি সুন্দরতম শিষ্টাচার হলো যখন মোমিন, মুসলিম একে অপরের সাক্ষাৎ হয়, তখন শুরুতেই একে অপরের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করে। কত ধরনের সম্ভাষণের প্রচলন আছে বর্তমান পৃথিবীতে। কিন্তু ইসলামের এ সুমহান সম্বোধন ও সম্ভাষণ অন্য যে কোনোটির তুলনায় অনন্য। ‘হাই’, ‘হ্যালো’ কিংবা শুভেচ্ছা, স্বাগতম জানানোর চেয়ে একে অপরের শান্তি কামনা করা কি উত্তম নয়? এটির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, তারা একে অপরের জন্য মোটেও ক্ষতিকারক নয়, বরং যে কোনো অনিষ্ট থেকে নিরাপদ। সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় এটি কল্যাণী ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস। এ সালামের ইতিহাস কিন্তু আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু হয়েছিল। তাকে জীবন (রুহ) দেওয়ার পর উপস্থিত ফেরেশতাদের সম্ভাষণ জানাতে বলা হয়েছিল। তিনি তাদের সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন ‘আসসালামু আলাইকুম (আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)’ বলে। প্রত্যুত্তরে ফেরেশতারা বলেছিলেন, ‘ওয়া আলাইকুমুসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ (আপনার/আপনাদের ওপরও শান্তি বর্ষিত হোক)।’ (মুসলিম : ৫৪৩)। সেই থেকে এ সম্ভাষণের প্রচলন চলে আসছে মুসলিমদের জন্য।

৩. খাদ্য এবং পানাহার ডান হাত দিয়ে গ্রহণ করা

কোনো যৌক্তিক কারণ ব্যতিরেকে একজন মুসলিমের জন্য বাম হাত দিয়ে খাদ্য ও পানিও গ্রহণ করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দিয়েছেন ‘তোমাদের মধ্যে যখন কেউ খাদ্য গ্রহণ করে, সে যেন ডান হাত দিয়ে খায়, আর যখন পানীয় পান করে, সে যেন ডান হাত দিয়ে পান করে। কারণ শয়তান বাম হাত দিয়ে খায় এবং পান করে।’ (মুসলিম : ৫০০৮)।

এটাও অন্যতম সুন্নাহ যে, খাবার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ (সংক্ষেপে ‘বিসমিল্লাহ’) (দেখুন : সুনানু আবি দাউদ : ৩৭৬৭ এবং সুনানু তিরমিজি : ১৮৫৮) এবং খাবার শেষে ‘আলহাদুলিল্লাহ আল্লাজি আতআমানা ওয়া সাকানা ওয়া জাআলানা মিনাল মুসলিমিন’ সংক্ষেপে আলহামদুলিল্লাহও বলা যেতে পারে। (দেখুন : সুনানু আবি দাউদ : ৩৮৫০ এবং সুনানু তিরমিজি : ৩৪৫৭)।

৪. হাঁচি দেওয়া এবং তৎপরবর্তী শিষ্টাচার

হাঁচি অত্যন্ত প্রাকৃতিক একটি ব্যাপার, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। অনেক সময় আমরা এটিকে চেপে রাখার চেষ্টা করি; কিন্তু তা অনুচিত। কারণ হাঁচির মাধ্যমে শরীরের দুর্বলতা ও অলসতা চলে যায়। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নির্দেশ হলো যে ব্যক্তি হাঁচি দেবে সে বলবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (সব প্রশংসা আল্লাহর)। যদি এটি কেউ শুনে থাকে তাহলে সে তার প্রত্যুত্তরে বলবে ‘ইয়ারহামুকুমুল্লাহ’ (আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন)। এ কথাটি হাঁচিদাতা শুনলে প্রত্যুত্তরে বলবেন ‘ইয়াহদিকুমুল্লাহ’ (আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন)। (দেখুন : সহিহ বোখারি : ১৪৩)।

৫. উপকারীর উপকার স্বীকার করা এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা

প্রকৃতিগতভাবে মানুষ প্রশংসা পছন্দ করে। যখন কেউ কোনো ভালো ও কল্যাণকর কাজ করেন, তখন ওই ব্যক্তিকে তার কাজের জন্য প্রশংসা করলে সে আনন্দিত হবে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো ও কল্যাণকর কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রশংসা করার শিষ্টাচার সম্পর্কে অবহিত করেছে ইসলাম। কেউ কাউকে যে কোনো ধরনের উপকার করলেই সঙ্গে সঙ্গে তার কৃতজ্ঞতায় বলা উচিত ‘জাজাকা আল্লাহু খায়রান’ (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন)। এক্ষেত্রে আমরা প্রাশ্চত্য সভ্যতার অনুকরণে ‘থ্যাংক ইউ’ বা ‘ধন্যবাদ’ না বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর শেখানো পরিভাষা ব্যবহার করলে সুন্নত পুরুজ্জীবিতকরণে সওয়াব পাব, ইনশাআল্লাহ।

ইসলাম শেখানো শিষ্টাচারগুলোর ভাষা যেমন মার্জিত ও সমধুর, তেমনি ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে তার প্রভাব বিস্তৃত। এসব শিষ্টাচারের ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিশ্চিত করতে পারলে একে অপরের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেমন স্থাপিত হবে, তেমনি শান্তিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আল্লাহ আমাদের তাঁর মনোনীত দ্বীনের পথে তাঁরই প্রেরিত রাসুল মুহাম্মদ (সা.) এর শেখানো পন্থা অনুসরণ করে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।


শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ