আল্লাহর কাছে মর্যাদা লাভের উপায়

0
51
শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ

ক্রাইম অনুসন্ধান ডেস্ক: দুনিয়ার জন্য ও দুনিয়াতে যে মর্যাদা, যা অর্জনের পথে মানুষ পরস্পর সংঘাতে ও লড়াইয়ে জড়িত হয়, সেটা জীবনকে ধ্বংস করে দেয়, চরিত্রকে নষ্ট করে ফেলে। মনকে দূষিত করে। নিয়তকে বরবাদ করে। বিশেষ করে যারা দ্বীনের বিনিময়ে দুনিয়ার মর্যাদা লাভ করে। ফলে তাদের আমলগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

কোরআন আল্লাহর নবী মুসা (আ.) এর মর্যাদা ও অবস্থানকে একটি উচ্চমার্গীয় বর্ণনায় উল্লেখ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনি আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান ছিলেন।’ (সূরা আহজাব : ৬৯)। অর্থাৎ তার রবের কাছে তার বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে। আল্লাহর কাছে তার বিশাল মর্যাদাগুলোর অন্যতম একটি ছিল, তিনি নিজের ভাই হারুনকে তার সঙ্গে নবী হিসেবে পাঠানোর জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন করেন। আল্লাহ তার আবেদন গ্রহণ করে বলেন, ‘আমি তার জন্য আমার অনুগ্রহস্বরূপ তার ভাই হারুনকে নবী হিসেবে দান করেছি।’ (সূরা মরিয়ম : ৫৩)।
আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার স্তরে পৌঁছতে পারা একটি উচ্চতম অবস্থান। এখানে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি করাটা বিশাল একটা অর্জন। সর্বোচ্চ মর্যাদার স্তরে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবায়ে কেরামের সংকল্প আমাদের আদর্শ। আল্লাহর রাসুল (সা.) এর সামনে একজন সাহাবি দোয়া করার সময় বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তোমার কাছে এমন ঈমান চাই যা বিচ্যুত হবে না, এমন নেয়ামত চাই যা শেষ হবে না। চিরস্থায়ী জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে তোমার নবী মুহাম্মদ (সা.) এর সঙ্গে থাকতে চাই।’
যাকে আল্লাহর দরবারের মর্যাদা দান করা হয়েছে তার জন্য শুভ সংবাদ। এটা যাবতীয় কল্যাণের ফল্গুধারা, যা শুকিয়ে যাবে না। এটা প্রশান্তি ও স্থিতির এমন একটা পরম আপন আনন্দ যার কাছে সব তুচ্ছ। তা জীবনকে এমন সুখে ভরপুর করে যার ধারেকাছে আর কিছুই তুল্য নয়। আল্লাহর কাছে যে মর্যাদাবান হয় সে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে। যে আল্লাহর নৈকট্যশীল হয় সে তার রবের কাছে কিছু চাইলে তিনি তাকে তা প্রদান করেন। সে তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তিনি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান এবং তাকে রক্ষা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ বলেন, বিভিন্ন নফল আমলের মাধ্যমে আমার বান্দা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, এক পর্যায়ে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি তখন আমি তার কর্ণ হই, যা দিয়ে সে শোনে, আমি তার চক্ষু হই, যা দিয়ে সে দেখে, আমি তার হাত হই, যা দিয়ে সে পাকড়াও করে, আমি তার পা হই, যা দিয়ে সে চলে। সে আমার কাছে প্রার্থনা করলে আমি তাকে সেটা প্রদান করি, যদি আমার কাছে আশ্রয় চায় আমি তাকে আশ্রয় দান করি।’
তোমার কেমন ধারণা সেই মহাবিশ্বের অধিপতির প্রতি যখন তিনি দান করেন? তিনি কী দিতে পারেন? তিনি যদি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হন তবে তোমার অবস্থা কেমন হবে? তিনি যদি তোমার জন্য যথেষ্ট হন এবং তোমাকে রক্ষা করেন তাহলে তোমার পরিণতি ও ভবিষ্যৎ কেমন হবে?
আল্লাহর কাছে মর্যাদা লাভ করা মানে উচ্চতায় ও স্বচ্ছতায় আরোহণ। প্রতিযোগীরা এ পথে প্রতিযোগিতা করে। এর জন্য তারা নিজেদের ক্ষিপ্র করে তোলে। এ মর্যাদার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম পর্যায় হচ্ছে আপনার রবের আপনাকে স্মরণ করা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সূরা বাকারা : ১৫২)।
দুনিয়ার জন্য ও দুনিয়াতে যে মর্যাদা, যা অর্জনের পথে মানুষ পরস্পর সংঘাতে ও লড়াইয়ে জড়িত হয়, সেটা জীবনকে ধ্বংস করে দেয়, চরিত্রকে নষ্ট করে ফেলে। মনকে দূষিত করে। নিয়তকে বরবাদ করে। বিশেষ করে যারা দ্বীনের বিনিময়ে দুনিয়ার মর্যাদা লাভ করে। ফলে তাদের আমলগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
আল্লাহর কাছে মর্যাদা অর্জন করলে তার আলো ও জ্যোতি তাদের ঈমানদার বংশধর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে এবং প্রসারিত হয়। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি দয়া ও অনুগ্রহ। আল্লাহ জান্নাতে মোমিন ব্যক্তির সঙ্গে তার ঈমানদার পরিবার-পরিজনের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। যদিও তারা আমলের ক্ষেত্রে তার চেয়ে পিছিয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততি তাদের অনুগামী হয়, তাদের সঙ্গে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল কিছুমাত্র হ্রাস করব না।’ (সূরা তুর : ২১)।
আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিরা এমন উচ্চ সম্মান ও স্তর অর্জন করেন, যা প্রতিভাত হয় আসমানবাসী ও দুনিয়াবাসীর কাছে তাদের সুন্দর আলোচনা, তাদের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়া ও তাদের জন্য সৌহার্দ্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাইল (আ.) কে ডেকে বলেন, আমি অমুক লোককে ভালোবাসি, তাই তুমিও তাকে ভালোবাস। তিনি বলেন, তখন জিবারইল তাকে ভালোবাসে। তারপর সে আসমানে ঘোষণা দিয়ে বলতে থাকে, আল্লাহ অমুক লোককে ভালোবাসে, সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাস। তখন আসমানবাসী তাকে ভালোবাসে। তিনি বলেন, তারপর দুনিয়ায়ও তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা স্থাপন করা হয়।’
বান্দার এ মর্যাদা তাকে এমন স্তরে নিয়ে যায়, যদি সে কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে কসম খায় আল্লাহ তার সম্মানার্থে ও তার বিশাল মর্যাদার কারণে সে বিষয়টি ঘটিয়ে দেন। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর বান্দাদের মাঝে এমন বান্দা আছে সে যদি আল্লাহর নাম নিয়ে কসম খায় তিনি সেটা বাস্তবায়ন করে দেন।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘অনেক এমন জীর্ণশীর্ণ লোক আছে, যারা দ্বারে দ্বারে তাড়িত হন, তারা আল্লাহর নামে কসম করলে তিনি তা পূর্ণ করে দেন।’
দুনিয়াতে সম্মান ও মর্যাদার নানা রূপ প্রকাশিত হয়; কিন্তু যে মর্যাদার প্রভাব স্থায়ী থাকে ও যার শ্রেষ্ঠত্বের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে সেটা আখেরাতেই প্রকাশিত হবে। আল্লাহ বলেন, ‘লক্ষ্য কর, আমি কীভাবে তাদের এক দলকে অপর দলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, আখেরাত তো নিশ্চয়ই মর্যাদায় মহত্তর ও গুণে শ্রেষ্ঠতর।’ (সূরা ইসরা : ২১)।
আল্লাহর কাছের এ বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান দরিদ্রদের বাদ দিয়ে শুধু ধনীদের জন্য নয়, আবার ধনীদের বাদ দিয়ে শুধু দরিদ্রদের জন্যও নয়। কেউ এ মর্যাদা পেতে চাইলে তার পথ সরল সঠিক পথ, সে পথের নিদর্শন ও চিহ্ন স্পষ্ট। এ পথের আদর্শ সরল। এর মানদ- হচ্ছে আমল বা সৎকর্ম। এর শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ হয় আনুগত্যে, নিষ্ঠা ও উদ্দেশ্যের সততার মাধ্যমে। এর উপায় হলো নামাজের সঙ্গে অন্তরের সম্পর্ক স্থাপন করা আর জামাতের সঙ্গে তা আদায়ের প্রতি যতœশীল হওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বেশি বেশি সিজদা করা তোমার কর্তব্য। কারণ তুমি আল্লাহর জন্য একটি সিজদা দিলেই তিনি তার দ্বারা তোমার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং একটি পাপ হ্রাস করেন।’
কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করলে, তদনুযায়ী আমল করলে ও তা মুখস্থ করলে সেটা কোরআনের বাহককে এমন উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের স্তরে নিয়ে যায় যার কোনো সীমা নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোরআনের ধারককে বলা হবে, পাঠ কর এবং উচ্চতায় আরোহণ কর। সুচারুরূপে পাঠ কর যেভাবে দুনিয়ায় পাঠ করতে। কারণ তোমার স্তর হবে তোমার পঠিত সর্বশেষ আয়াত পর্যন্ত।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যে কোরআন পাঠ করে ও তা হেফাজত করে তার দৃষ্টান্ত হবে সৎকর্মশীল সম্মানিত লোকদের সঙ্গে।’ যারা কোরআনের ধারক-বাহক তারা আল্লাহর বিশেষ বান্দা ও আল্লাহর লোক।
ইলম, ঈমান ও দয়াময় আল্লাহর জিকির নিয়ে মগ্নতার সমন্বয় সাধন করে মাওলার কাছে মর্যাদার শীর্ষ স্তরে পৌঁছা যায়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের ইলম দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদা উন্নীত করেন।’ (সূরা মুজাদালাহ : ১১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মনিবের কাছে শ্রেষ্ঠতম ও পবিত্রতম আমল সম্পর্কে অবহিত করব? যা তোমাদের পুণ্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চতম, যা স্বর্ণ-রুপা প্রদানের চেয়েও তোমাদের জন্য উত্তম, তোমাদের শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে মিলিত হয়ে পরস্পরের গর্দানে আঘাত করার চেয়েও উত্তম।’ লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, সেটা কী? তিনি বললেন, ‘আল্লাহর জিকির করা।’
আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাশীল লোকদের অবিচ্ছেদ্য কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমলনামায় যেগুলো ভারি হবে, এগুলোর মাধ্যমে তারা মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের সোপানে আরোহণ করবে। সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে সুন্দর আচরণ, উন্নত চরিত্র, মনের উদারতা ও সৃষ্টির প্রতি দয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সুন্দর চরিত্রের দ্বারা ব্যক্তি রাতের ইবাদতকারী ও দিবসের রোজাদারের পুণ্য লাভ করে।’


শেয়ার করে সকল কে জানিয়ে দিনঃ